দৈব-চিকিৎসক ‘হাড়ভাঙ্গা বুড়ি’র বুজরুকি চিকিৎসা

3rd July 2024 9:43 am স্থানীয় খবর
দৈব-চিকিৎসক ‘হাড়ভাঙ্গা বুড়ি’র বুজরুকি চিকিৎসা


দৈব-চিকিৎসক ‘হাড়ভাঙ্গা বুড়ি’র বুজরুকি চিকিৎসা

 -ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতি'র তদন্ত অভিযান

- বাদুড়িয়া থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের

কোলকাতা : কোনও কারণ ভেঙ্গে গেছে হাত, পা বা শরীরের হাড় ? ব্যাথা ও যন্ত্রনায় এক মুহুর্ত শান্তি পাচ্ছেন না ? দুশ্চিন্তা করবেন না। রাজধানী কোলকাতা থেকে প্রায় 50 কিলোমিটার দূর যে কোন ধরণের ভাঙ্গা হাড় জুড়ে দেওয়ার দৈব-চিকিৎসার জন্য বিখ্যাত উত্তর ২৪ পরগনা জেলার মছলন্দপুরের ঘোষপুরের চারাবটতলা। ঐ অঞ্চলে প্রায় 80 বছর বয়সী লক্ষ্মী মণ্ডলের ‘হাড়ভাঙ্গা বুড়ি’ নামে প্রসিদ্ধ। ইনি যে কোন ভাঙ্গা হাড় শুধুমাত্র দৈব-চিকিৎসার মাধ্যমে জুড়ে দিয়ে থাকনে।

প্রতি সপ্তাহের মঙ্গলবার এবং শনিবার সকালের সূর্য উদয় হওয়ার আগেই দূর-দূরান্ত থেকে রূগীরা ভিড় করে আসেন মছলন্দপুরের ঘোষপুর এলাকায় ‘হাড়ভাঙ্গা বুড়ি’র অলৌকিক চিকিৎসা শিবিরে। এই ভিড় হার মানাতে পারে যে কোনও প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রকেও। বুড়ির এক ফুঁয়ে জুড়ে যায় ভাঙা হাড়। শুধু তাই নয়, ব্যথা-বেদনা শারীরিক সমস্যারও ফূঁ দিয়েই সমাধান করেন বৃদ্ধা লক্ষ্মী মণ্ডল ওরফে ‘হাড়ভাঙ্গা বুড়ি’।

শুধু হাড় ভাঙা রোগীরা নন, বিভিন্ন ধরনের শারীরিক অসুস্থতা নিয়েও অনেক লোকেরা আসেন এখানে। ‘হাড়ভাঙ্গা বুড়ি’র কাছে দৈব-চিকিৎসা করার জন্য রুগীকে সঙ্গে নিয়ে আসতে হয় শুধুমাত্র একটি শিশিতে সর্ষের তেল ও কালো কার। লক্ষ্মী মণ্ডল রুগী দেখে তার কাছ থেকে তেলের বোলত নিয়ে তাতে ফুঁ দেন। কালো কারের সঙ্গে বিশেষ গাছের শিকড় রুগীর গলায় বেধে দেন। এতেই ভাঙা হাড় জুড়বে। শিকড় ও হাড়ভাঙ্গা বুড়ির ফূঁ দেওয়া তেলেই নিরাময় হয় নানা কঠিন শারীরিক সমস্যার বলে দাবি। এমনকী বড় বড় হাসপাতাল ও নার্সিংহোম থেকে ফেরত আসা অ-সফল অস্ত্রোপচার রোগীদেরও হাড় জুড়ে সুস্থ করে দিয়েছেন লক্ষ্মী দেবী এমনটাও দাবি উপকার পাওয়া রোগী ও রোগী পরিবারদের।

লক্ষ্মী মণ্ডল ওরফে ‘হাড়ভাঙ্গা বুড়ি’র দাবি, প্রায় তিন পুরুষ ধরে স্বপ্নাদেশে পাওয়া এই বিশেষ মন্ত্র বলেই এখনও মানুষদের সেবা করে চলেছেন। শুধু এই জেলা এমনকী নানা রাজ্য থেকেও এখন রোগীরা এই তার কাছে আসেন শারীরিক সমস্যা নিবারণের জন্য। যত দিন বাড়ছে, ততই যেন হাড়ভাঙা বুড়ির এই বাড়িতে বাড়ছে রোগীর ভিড়। এলাকার বহু মানুষ এখন এই হাড়ভাঙা বুড়িকে কেন্দ্র করে রীতিমতো ব্যবসাও চালাচ্ছেন। এলাকায় দেখা গেল সরসের তেল, কালো কার থেকে শুরু করে বিভিন্ন খাবারের পসরা নিয়ে বসেছেন অনেকে।

এই খবর কানে আসার পর ‘ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতি’র সহ-সভাপতি সন্তোষ শর্মার নেতৃত্বে বিজয় কৃষ্ণ, শেখ সিরাজ আলী, সৌরাষ্ট্র দাশ -এর এক তদন্তকারী দল নিজের পরিচয় গোপন রেখে পৌছে যায় লক্ষ্মী মণ্ডল ওরফে ‘হাড়ভাঙ্গা বুড়ি’ দৈব চিকিৎসা শিবিরে। তাঁরা সেখানে আগত রুগী ও স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলেন। যুক্তিবাদী সন্তোষ শর্মা নিজের ডান পায়ের সমস্যার চিকিৎসা লক্ষ্মী মণ্ডলের হাতে করান। তিনি দৈব-চিকিৎসা করার জন্য লক্ষ্মী মণ্ডলের হাতে টাকাও দেন। ‘হাড়ভাঙ্গা বুড়ি’র দাবি, তিনি দৈব-চিকিৎসার জন্য রুগীর কাছ থেকে কোনও টাকার দাবি করেন না।

যুক্তিবাদীরা তদন্ত করে দেখেন, দৈব-চিকিৎসার নামে অসহায়,গরীব, রূগীদের সঙ্গে প্রতারণ করছেন লক্ষ্মী মণ্ডল। আইন ও চিকিৎসা ব্যবস্থাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে দিন-দুপুড়ে চলছে দৈব-চিকিৎসক ‘হাড়ভাঙ্গা বুড়ি’র বুজরুকি চিকিৎসা। এই বুজরুকি অবশ্যই বন্ধ হওয়া উচিৎ। এই দাবী জানিয়ে সন্তোষ শর্মা, বিজয় কৃষ্ণ ও সিরাজরা ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতির তরফ থেকে বাদুড়িয়া থানায় লক্ষ্মী মণ্ডল ওরফে ‘হাড়ভাঙ্গা বুড়ি’র বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।

যুক্তিবাদীরা, খোঁজ নিয়ে জেনেছেন যে কোন ‘ড্রাগ লাইসেন্স’ চাড়াই প্রতি শনি ও মঙ্গলবার লক্ষ্মী মণ্ডল অসংখ্য মানুষকে এইভাবে অলৌকিক চিকিৎসা করে চলেছেন, যা আইনত সম্পূর্ণ বে-আইনি।

দ্য ড্রাগস অ্যান্ড ম্যাজিক রেমেডিস (আপত্তিকর বিজ্ঞাপন) আইন, 1954 এবং ড্রাগ এন্ড কসমেটিকস অ্যাক্ট, 1940 অনুসারে, দৈব উপায়ে যে কোন রোগের চিকিৎসা করা দণ্ডনীয় অপরাধ। এই আইনগুলির অনুসারে, ‘ড্রাগ লাইসেন্স’ ছাড়া যদি কেউ ( ‘হাড়ভাঙ্গা বুড়ি’র মত ) তেলপড়া, ঝাড়ফুঁক, তন্ত্রমন্ত্র, শিকড় ইত্যাদি দিয়ে ভাঙ্গা হাড় জুড়ে দেওয়া অথবা যে কোন রোগের দৈব চিকিৎসা করার দাবি করেন তাহলে তাঁর জেল ও জরিমানা দুই হবে।

ভাবতে অবাক লাগে আজও আনেক মানুষ ঝাড়ফুঁক, তন্ত্রমন্ত্র, তেলপড়া, শেকড়- বাকড়, দৈব ও অলৌকিক চিকিৎসায় বিশ্বাস করে ‘হাড়ভাঙ্গা বুড়ি’র মতন বুজরুকের কাছে প্রতারনার শিকার হচ্ছেন। এই সব বুজরুকদের মুখোস খুলে দেওয়ার জন্য বারে-বারে পথে নামছেন যুক্তিবাদীরা।

এই বুজরুকদের শুধু মুখোশ খুলে দিলেই হবে না। চিকিৎসার নামে সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা এই বুজরুকের বিরুদ্ধে আইন অনুসারে পুলিশ ও প্রশাসনের কাছে অভিযোগ জানবার দারকার আছে।

আজও এই রাজ্যের সরকারি হাসপাতালগুলিতে সঠিক চিকিৎসা পরিসেবা মেলে না। আর্থিক এবং অন্ধবিশ্বাসে ডুবে থেকে মানুষ দৈব চিকিৎসার চক্করে পড়ে নিজের জীবনে বিপদ ডেকে আনেন। অন্য দিকে, প্রকাশ্যে বুজরুকি ব্যবসা চললেও পুলিশ ও প্রশাসন উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করে না। ফলে, বুজরুকি ব্যবসা ফুলেফেঁপে ওঠে। এমন অবস্থায় দায়িত্ব বাড়ে যুক্তিবাদীদের।





Others News

ভাদ্র শেষে লৌহ পাব্বন - যুক্তিবাদ ও মানবতাবাদ প্রচারের উদ্দেশ্যে একটা আড্ডা

ভাদ্র শেষে লৌহ পাব্বন - যুক্তিবাদ ও মানবতাবাদ প্রচারের উদ্দেশ্যে একটা আড্ডা


"ভাদ্র শেষে লৌহ পাব্বন"। হ্যাঁ, ঠিক এই নামেই ধর্মীয় আচার বর্জিত এক আড্ডার আয়োজন করলেন বেলঘরিয়ার আড়িয়াদহ এলাকার এক ক্ষুদ্র কারখানার মালিক মানষ মাইতি। তিনি সমাজকে এক নতুন বার্তা দিলেন। মানবতাবাদী যুক্তিবাদী ও বিজ্ঞানমনস্ক মানুষদেরকে নিয়ে একটি অনুষ্ঠান করেন। সাক্ষ্য এবং সহায়ক হতে আমন্ত্রণ জানালেন ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতিকে। আমন্ত্রনে উৎসাহী হয়ে এগিয়ে এলেন ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতির জেলা সম্পাদক সিরাজ, ও সমিতির সদস্যরা। মিলিত ক্ষুদ্র প্রচেষ্টায় পূজার পরিবর্তে এই দিনে ভিন্নভাবে উৎসবে মেতে ওঠেন মানবতাবাদী, যুক্তিবাদী, বিজ্ঞানমনস্ক মুক্তমনা মানুষেরা। অনুষ্ঠানের সুর ধরিয়ে দিলেন ক্ষুদ্র বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে ওই কারখানারই শ্রমিক যোগেন ভৌমিক। তার ভাবনার চোখ দিয়ে আঙুল উঁচিয়ে দেখালেন শ্রমিক শ্রেণীদের কিভাবে শোষণ করা হচ্ছে। এবং তার পরিবর্তে বছরে একটা দিন তাদের নেশাগ্রস্ত করে তাদেরকে আবার কিভাবে একটি বছর অক্লান্ত পরিশ্রম করানো হয় অল্প কিছু পারিশ্রমিকের বিনিময়। তিনি তার বক্তব্যের মাধ্যমে তুলে ধরেন বিশ্বকর্মা নয়, মানুষই পূজনীয়। পুরাণের বেহুলা লক্ষ্মীন্দরের লোহার ঘর নির্মাণের ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, বিশ্বকর্মা কখনও পূজনীয় হতে পারেন না। মানষ মাইতি তার কারখানায় পুজো না করে তার ক্ষুদ্র প্রয়াসের মধ্যে সমাজকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন এটি একটি মানুষের তৈরি রীতি এই রীতির সঙ্গে বিশ্বাসের সম্পর্ক জুড়েছে এর সাথে বাস্তবের কোনো সম্পর্ক নেই। মানুষের ভাগ্য বলে কিছু নেই। মানষ মাইতি আরো কিছু বক্তব্যের মধ্যে মূল্যবান একটি কথা বলেন। বিশ্বকর্মা পূজা নয়, বিশ্বকর্মা পূজার দ্বারা কারখানার উন্নতি এবং ভবিষ্যৎ উন্নত হতে পারে না। কিন্তু দিনে দিনে বিশ্বকর্মা পূজা কে কেন্দ্র করে এই দিনে যেভাবে নেশার শিকার হচ্ছে মানুষ, তাতে অবশ্যই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি নেশাগ্রস্ত সমাজে পরিণত হবে সেই অনুমান করা যায়। বিশ্বকর্মা পূজা না করে তিনি তার শ্রমিকদেরকে তাদের অধিকারের কথা বলেন সাম্যের সমাজের দাবি তোলেন। লৌহ পাব্বন দিনে সকলেই যখন বিশ্বকর্মা পুজোয় মেতে উঠেছেন তখন তার এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগকে অনুষ্ঠানে উপস্থিত সকলেই মুক্ত কন্ঠে প্রশংসা করেন। আড্ডায় সকলেই একমত হন এই যে- মানুষের হাতে তৈরী ভগবান মানুষের চলার পথে কোনো ভূমিকা রাখতে পারে না। ভগবানের অবদান শূন্য। এই পুজো, উৎসব কেন্দ্র করে যে বাজার গড়ে ওঠে তার বিকল্প সন্ধানে প্রশাসনের কর্মকর্তারা উদাসীন। একই সাথে খেটে খাওয়া দিনমজুর স্থায়ী, অস্থায়ী শ্রমিকদের মদ মাংসে আনন্দে মাতিয়ে তুলেছেন কল কারখানার মালিক থেকে ক্ষুদ্র শিল্প মালিকানা ব্যক্তিরা। যুক্তিবাদী সমিতির সদস্যা আনজুরা দুঃখের সাথে বলেন, পুজো পার্বণ এলে মানুষের মধ্যে প্রধানত দুটি ভাগে বিভাজন হয়ে যায়। পুজোর পরিবর্তে শ্রমিকদের নিয়ে ধর্মীয় আচার বর্জিত অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে তিনি তার আনন্দ প্রকাশ করেন। এবং বলেন মানুষকে একটি জাতি, ধর্মের দ্বারা বিভাজন করা চিরস্থায়ীভাবে সম্ভব নয়। এই অনুষ্ঠানই তার স্বাক্ষ্য রইল। এই অনুষ্ঠানে এসে আমি গর্বিত। থিয়েটার কর্মী ও যুক্তিবাদী সমিতির সদস্য আশিস মজুমদার বলেন- এই রকম একটা উদ্যোগের সাক্ষী হতে পেরে আমি গর্বিত। সঙ্গে তিনি এও জানতে চান "ভাদ্র শেষে লৌহ পাব্বন" অনুষ্ঠানটি কি বিশ্বকর্মা পুজোর দিন পরিবর্তন হলে এই দিনটিও পরিবর্তন হবে? নাকি প্রতিবছর একই দিনে হবে? যুক্তিবাদী সমিতির সদস্য রামকৃষ্ণ সাহা স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন। তার কবিতায় ফুটে ওঠে- সাধারণ মানুষের দুঃখ দৈন্যদশার চিত্র। তিনি আরও বলেন সরকার শিল্পপতিদের তোষন করেন। আর সাধারণ মানুষের উদ্দেশ্যে বলেন ভাগ্যের দোহাই দিয়ে পরাজয়, দুর্দশা মেনে নেওয়া মানে শোষকের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়া। তাই ভাগ্য নির্ভর না হয়ে ঘটনার বিশ্লেষণের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে বলেন। যুক্তিবাদী সমিতির উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলা কমিটির সম্পাদক সিরাজ এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন। বর্তমান সময়ে ধর্মের নামে দেশে বিদেশে যে অস্থিরতা তৈরী হয়েছে তার মোকাবিলায় যুক্তিই একমাত্র সঠিক দিশা দেখাতে পারে। তাই ধর্মমত নির্বিশেষে সবাইকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলার আহ্বান জানান।