দৈব-চিকিৎসক ‘হাড়ভাঙ্গা বুড়ি’র বুজরুকি চিকিৎসা
-ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতি'র তদন্ত অভিযান
- বাদুড়িয়া থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের
কোলকাতা : কোনও কারণ ভেঙ্গে গেছে হাত, পা বা শরীরের হাড় ? ব্যাথা ও যন্ত্রনায় এক মুহুর্ত শান্তি পাচ্ছেন না ? দুশ্চিন্তা করবেন না। রাজধানী কোলকাতা থেকে প্রায় 50 কিলোমিটার দূর যে কোন ধরণের ভাঙ্গা হাড় জুড়ে দেওয়ার দৈব-চিকিৎসার জন্য বিখ্যাত উত্তর ২৪ পরগনা জেলার মছলন্দপুরের ঘোষপুরের চারাবটতলা। ঐ অঞ্চলে প্রায় 80 বছর বয়সী লক্ষ্মী মণ্ডলের ‘হাড়ভাঙ্গা বুড়ি’ নামে প্রসিদ্ধ। ইনি যে কোন ভাঙ্গা হাড় শুধুমাত্র দৈব-চিকিৎসার মাধ্যমে জুড়ে দিয়ে থাকনে।
প্রতি সপ্তাহের মঙ্গলবার এবং শনিবার সকালের সূর্য উদয় হওয়ার আগেই দূর-দূরান্ত থেকে রূগীরা ভিড় করে আসেন মছলন্দপুরের ঘোষপুর এলাকায় ‘হাড়ভাঙ্গা বুড়ি’র অলৌকিক চিকিৎসা শিবিরে। এই ভিড় হার মানাতে পারে যে কোনও প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রকেও। বুড়ির এক ফুঁয়ে জুড়ে যায় ভাঙা হাড়। শুধু তাই নয়, ব্যথা-বেদনা শারীরিক সমস্যারও ফূঁ দিয়েই সমাধান করেন বৃদ্ধা লক্ষ্মী মণ্ডল ওরফে ‘হাড়ভাঙ্গা বুড়ি’।
শুধু হাড় ভাঙা রোগীরা নন, বিভিন্ন ধরনের শারীরিক অসুস্থতা নিয়েও অনেক লোকেরা আসেন এখানে। ‘হাড়ভাঙ্গা বুড়ি’র কাছে দৈব-চিকিৎসা করার জন্য রুগীকে সঙ্গে নিয়ে আসতে হয় শুধুমাত্র একটি শিশিতে সর্ষের তেল ও কালো কার। লক্ষ্মী মণ্ডল রুগী দেখে তার কাছ থেকে তেলের বোলত নিয়ে তাতে ফুঁ দেন। কালো কারের সঙ্গে বিশেষ গাছের শিকড় রুগীর গলায় বেধে দেন। এতেই ভাঙা হাড় জুড়বে। শিকড় ও হাড়ভাঙ্গা বুড়ির ফূঁ দেওয়া তেলেই নিরাময় হয় নানা কঠিন শারীরিক সমস্যার বলে দাবি। এমনকী বড় বড় হাসপাতাল ও নার্সিংহোম থেকে ফেরত আসা অ-সফল অস্ত্রোপচার রোগীদেরও হাড় জুড়ে সুস্থ করে দিয়েছেন লক্ষ্মী দেবী এমনটাও দাবি উপকার পাওয়া রোগী ও রোগী পরিবারদের।
লক্ষ্মী মণ্ডল ওরফে ‘হাড়ভাঙ্গা বুড়ি’র দাবি, প্রায় তিন পুরুষ ধরে স্বপ্নাদেশে পাওয়া এই বিশেষ মন্ত্র বলেই এখনও মানুষদের সেবা করে চলেছেন। শুধু এই জেলা এমনকী নানা রাজ্য থেকেও এখন রোগীরা এই তার কাছে আসেন শারীরিক সমস্যা নিবারণের জন্য। যত দিন বাড়ছে, ততই যেন হাড়ভাঙা বুড়ির এই বাড়িতে বাড়ছে রোগীর ভিড়। এলাকার বহু মানুষ এখন এই হাড়ভাঙা বুড়িকে কেন্দ্র করে রীতিমতো ব্যবসাও চালাচ্ছেন। এলাকায় দেখা গেল সরসের তেল, কালো কার থেকে শুরু করে বিভিন্ন খাবারের পসরা নিয়ে বসেছেন অনেকে।
এই খবর কানে আসার পর ‘ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতি’র সহ-সভাপতি সন্তোষ শর্মার নেতৃত্বে বিজয় কৃষ্ণ, শেখ সিরাজ আলী, সৌরাষ্ট্র দাশ -এর এক তদন্তকারী দল নিজের পরিচয় গোপন রেখে পৌছে যায় লক্ষ্মী মণ্ডল ওরফে ‘হাড়ভাঙ্গা বুড়ি’ দৈব চিকিৎসা শিবিরে। তাঁরা সেখানে আগত রুগী ও স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলেন। যুক্তিবাদী সন্তোষ শর্মা নিজের ডান পায়ের সমস্যার চিকিৎসা লক্ষ্মী মণ্ডলের হাতে করান। তিনি দৈব-চিকিৎসা করার জন্য লক্ষ্মী মণ্ডলের হাতে টাকাও দেন। ‘হাড়ভাঙ্গা বুড়ি’র দাবি, তিনি দৈব-চিকিৎসার জন্য রুগীর কাছ থেকে কোনও টাকার দাবি করেন না।
যুক্তিবাদীরা তদন্ত করে দেখেন, দৈব-চিকিৎসার নামে অসহায়,গরীব, রূগীদের সঙ্গে প্রতারণ করছেন লক্ষ্মী মণ্ডল। আইন ও চিকিৎসা ব্যবস্থাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে দিন-দুপুড়ে চলছে দৈব-চিকিৎসক ‘হাড়ভাঙ্গা বুড়ি’র বুজরুকি চিকিৎসা। এই বুজরুকি অবশ্যই বন্ধ হওয়া উচিৎ। এই দাবী জানিয়ে সন্তোষ শর্মা, বিজয় কৃষ্ণ ও সিরাজরা ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতির তরফ থেকে বাদুড়িয়া থানায় লক্ষ্মী মণ্ডল ওরফে ‘হাড়ভাঙ্গা বুড়ি’র বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
যুক্তিবাদীরা, খোঁজ নিয়ে জেনেছেন যে কোন ‘ড্রাগ লাইসেন্স’ চাড়াই প্রতি শনি ও মঙ্গলবার লক্ষ্মী মণ্ডল অসংখ্য মানুষকে এইভাবে অলৌকিক চিকিৎসা করে চলেছেন, যা আইনত সম্পূর্ণ বে-আইনি।
দ্য ড্রাগস অ্যান্ড ম্যাজিক রেমেডিস (আপত্তিকর বিজ্ঞাপন) আইন, 1954 এবং ড্রাগ এন্ড কসমেটিকস অ্যাক্ট, 1940 অনুসারে, দৈব উপায়ে যে কোন রোগের চিকিৎসা করা দণ্ডনীয় অপরাধ। এই আইনগুলির অনুসারে, ‘ড্রাগ লাইসেন্স’ ছাড়া যদি কেউ ( ‘হাড়ভাঙ্গা বুড়ি’র মত ) তেলপড়া, ঝাড়ফুঁক, তন্ত্রমন্ত্র, শিকড় ইত্যাদি দিয়ে ভাঙ্গা হাড় জুড়ে দেওয়া অথবা যে কোন রোগের দৈব চিকিৎসা করার দাবি করেন তাহলে তাঁর জেল ও জরিমানা দুই হবে।
ভাবতে অবাক লাগে আজও আনেক মানুষ ঝাড়ফুঁক, তন্ত্রমন্ত্র, তেলপড়া, শেকড়- বাকড়, দৈব ও অলৌকিক চিকিৎসায় বিশ্বাস করে ‘হাড়ভাঙ্গা বুড়ি’র মতন বুজরুকের কাছে প্রতারনার শিকার হচ্ছেন। এই সব বুজরুকদের মুখোস খুলে দেওয়ার জন্য বারে-বারে পথে নামছেন যুক্তিবাদীরা।
এই বুজরুকদের শুধু মুখোশ খুলে দিলেই হবে না। চিকিৎসার নামে সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা এই বুজরুকের বিরুদ্ধে আইন অনুসারে পুলিশ ও প্রশাসনের কাছে অভিযোগ জানবার দারকার আছে।
আজও এই রাজ্যের সরকারি হাসপাতালগুলিতে সঠিক চিকিৎসা পরিসেবা মেলে না। আর্থিক এবং অন্ধবিশ্বাসে ডুবে থেকে মানুষ দৈব চিকিৎসার চক্করে পড়ে নিজের জীবনে বিপদ ডেকে আনেন। অন্য দিকে, প্রকাশ্যে বুজরুকি ব্যবসা চললেও পুলিশ ও প্রশাসন উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করে না। ফলে, বুজরুকি ব্যবসা ফুলেফেঁপে ওঠে। এমন অবস্থায় দায়িত্ব বাড়ে যুক্তিবাদীদের।